গ্রন্থাগার আন্দোলন সংযুক্ত রাজ্য (UK) বিশ্বের ভেতরে অগ্রণী। প্রকৃতপক্ষে ‘পাবলিক লাইব্রেরি অ্যাক্ট’ ১৮৫০ পাশ হবার পর ব্রিটেন গ্রন্থাগার আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। তবে এই আন্দোলন অনুধাবন করার আগে ১৮৫০ সালের পূর্বেকার গ্রন্থাগারের অবস্থান বুঝে নেওয়া দরকার।

ইংল্যান্ডের শিক্ষাবিপ্লব গ্রন্থাগার আন্দোলনে ভালো রকম ইন্ধন জুগিয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে বহুসংখ্যক শ্রমিক নিযুক্ত করা হয়েছিল। ওদের ছিল জ্ঞানের তৃষ্ণা।
তার ফলে দেশ জুড়ে অনেক গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা হয়। মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে শিক্ষা প্রসারের ফলেও দেশ জুড়ে অনেক গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা হয়। মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যেও শিক্ষা প্রসারের ফলেও গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন দেখা দেয়। এছাড়াও নিবেদিত প্রাণ ও মানববন্ধরাও গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসেন।
ব্রিটেনে সাধারণ গ্রন্থাগারের (public library) মধ্যে নিম্নলিখিতগুলি অগ্রগণ্য :
1. ধর্মীয় গ্রন্থাগার
মধ্যযুগের ইউরোবে চার্চগুলি এক মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। এই সময়কার চার্চগুলির দিকে দৃষ্টি দিলে প্রথমে গ্রন্থাগারের দিকে নজর পড়বে। খ্রিস্টধর্ম প্রচারের সঙ্গী সঙ্গী একদল সাহসী লোকের আবির্ভাব ঘটে যারা চার্চ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল।
প্রকৃতপক্ষে সাধক জীবনে ধর্মীয় পুঁজি অধ্যায়ন ও পাণ্ডুলিপি অনুলিখনের প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই সবরকম ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের নিজস্ব ধর্মপুস্তক ও পাণ্ডুলিপির সংগ্রহ গড়ে ওঠে। বর্তমানের নিরিখে যেসব গ্রন্থাগার ছিল ক্ষুদ্র।
সেগুলিকে সাধারণ গ্রন্থাগার বলা ঠিক হবে না, যদিও কিছু শর্তসাপেক্ষে জনসাধারণ সেগুলিকে ব্যবহার করতে পারত। সাধারণ মানুষের জন্য এই সেগুলি করা হয়েছিল। সংস্কারের সময়ে সেসব গ্রন্থাগারের বিলোপ ঘটে।
2. দানপত্র দ্বারা গঠিত গ্রন্থাগার
এসব গ্রন্থাগার পঞ্চদশ শতাব্দীতে গড়ে উঠেছিল। এগুলি ছিল একজনের বা কয়েকজনের দানের ফল। ১৫৫০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে এরকম দুই শোরও বেশি গ্রন্থাগার তৈরি হয়েছিল। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ১৬৮০ সালের মধ্যে এসব গ্রন্থাগারের বেশিরভাগ শহরে তৈরি হয়েছিল।
১৬০০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত গ্রামাঞ্চলের প্রয়োজনেও নজর দেওয়া হয়। ১৬৮০ থেকে ১৭২০ সালের মধ্যে এ ধরণের প্রায় ৮০টি গ্রন্থাগার তৈরি হয় এবং ১৭২০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে এরকম আরও কিছু গ্রন্থাগার গড়ে ওঠে।
এগুলির বেশিরভাগই ছিল শহর থেকে দূরে প্রাদেশিক গ্রন্থাগার। কোনো কোনো গ্রন্থাগারে বই ধারে দেওয়া হত। মানুষের দানে গড়ে ওঠা গ্রন্থাগারকে চাঁদা ব্যবস্থার গ্রন্থাগারে পরিবর্তনের দৃষ্টান্তও আছে।
ডক্টর থমাস ব্রে ১৭৩০ সালে তার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রতি প্রদেশে পাদরিদের ধরে বই দেওয়া ধর্মীয় গ্রন্থাগার, ও গ্রাম্য যাজক ও অন্যদের ব্যবহারের জন্য অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র গ্রন্থাগারগুলির ওপর গবেষণা করেছেন।
আঞ্চলিক গ্রন্থাগারগুলি সংরক্ষণের জন্য ১৭০৯ সালে একটি আইন পাশ হয়। এই আইনে চার্চার ও যাজকদের তাদের নিজের নিজের গ্রামে গ্রন্থাগার তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু আইনটি শেষ পর্যন্ত কার্যকরী হয়নি। ১৭৩০ সালে স্যার জন চেসিরের হলটন গ্রামে একটি গ্রন্থাগার তৈরি করেন।
3. গ্রাহক চাঁদায় পরিচালিত গ্রন্থাগার
১৮শ শতিকা শেষ হবার আগেই ব্রিটিশ সমাজে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয় । শিক্ষার প্রসার, সংবাদপত্রের আবির্ভাব, তথ্য আদানপ্রদানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসাবে কফি হাউসের ভূমিকা এবং এধরণের আরও সব ব্যবস্থার ফলে মানুষের পড়াশোনার অভ্যাস গড়ে ওঠে ।
এর ফলে গ্রাহকচাঁদার মাধ্যমে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পথ পরিষ্কার হয় । ১৮৫০ সালের আগে পর্যন্ত তিন ধরণের গ্রাহকচাঁদার গ্রন্থাগার ছিল :
(i) ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত চাঁদার গ্রন্থাগার :
চাঁদা আদায়ের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থাগার সর্বত্র এক ধরণের ছিল না । কখনো কখনো বন্ধু বা আত্মীয়স্বজন অগ্রণী হয়ে বই অথবা নগদ অর্থদানের মাধ্যমে গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছে । কোনো কোনো ক্ষেত্রে সদস্যরা বই কেনার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ নিয়ে এগিয়ে এসেছে ।
এরকম কিছু প্রতিষ্ঠানকে ‘উদ্ভলোকের সমাজ’ বলেও অভিহিত করা হত । এরকম চাঁদার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থাগার অংশীদার বা মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত ।
(ii) বুক ক্লাব (Book club) :
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এ ধরণের গ্রন্থাগার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল । এগুলিও ছিল একধরণের চাঁদার গ্রন্থাগার । কিন্তু মূল গ্রাহকচাঁদার গ্রন্থাগার থেকে এগুলির তিনটি বিষয়ে পার্থক্য ছিল ।
- (ক) তাদের সদস্যসংখ্যা ছিল কম ;
- (খ) স্থায়ী সংগ্রহ গড়ে তুলতে সদস্যদের আগ্রহ ছিল না ;
- (গ) ওরা সামাজিক এবং সাহিত্য বিষয়ক প্রয়োজন মেটাত ।
সদস্যরা মাসে একবার ভোজসভায় মিলিত হয়ে পুস্তক বিনিময় করত অথবা নতুন বই কেনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত । প্রতিটি ক্লাবের নিজস্ব কাজের ধরণ ছিল । কিন্তু তারা প্রত্যেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব পালন করত ।
যেহেতু ক্লাবের কোনো স্থায়ী ঠিকানা ছিল না, তাই নিঃসন্দেহে তাদের খরচ ছিল কম এবং শ্রমিকশ্রেণির উপযোগী ।
(iii) ব্যবসাভিত্তিক প্রাম্যগান গ্রন্থাগার :
এসব গ্রন্থাগার পুস্তক বিক্রেতাদের দ্বারা পরিচালিত হত এবং লাভ করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য । এসব গ্রন্থাগারে তাত্ত্বিক, বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যের গ্রন্থ থাকত । তবে নভেল ও বিনোদন সাহিত্যের সংখ্যাই ছিল বেশি । কিছু নগদ মূল্যের বিনিময়ে ধারে বই পাওয়া যেত ।
যদিও ব্যবসা করাই ছিল এসব গ্রন্থাগারের উদ্দেশ্য, কিন্তু কালক্রমে উপন্যাসের আকর্ষণে এখানে দিনে দিনে পাঠকের সংখ্যা বাড়তে থাকে । জানা মতে প্রথম প্রাম্যগান গ্রন্থাগারটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন একজন পুস্তক বিক্রেতা ।
এলন রামসে নামের ভদ্রলোক ১৭২৫ সালে এডিনবর্গে এধরণের প্রথম গ্রন্থাগারটি স্থাপন করেন । ১৮২৫ সালের মধ্যে সারা দেশে এধরণের প্রায় ১৫০০টি প্রাম্যগান গ্রন্থাগার গড়ে উঠেছিল ।
4. কারিগরি প্রতিষ্ঠানিক গ্রন্থাগার
শিল্পবিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডে কলকারখানার সজ্জো যুক্ত এক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হয় । কারখানায় নিয়ুক্ত লোকদের মেকানিক বলা হত । এধরণের প্রতিষ্ঠান শিল্পকেন্দ্রের কাছেও খোদ লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ।
শিল্পবিপ্লবের পর শিল্পক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে শিল্পানবিশদের প্রশিক্ষণ ও তাদের কল্যাণের ব্যাপারে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয় । ১৮০০ খ্রি. জর্জ বিরবেক নামের একজন স্কটিশ দর্শনের শিক্ষক মেকানিক শিক্ষানবিশদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও একটি গ্রন্থাগার শুরু করেন ।
তারপর তার দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই এ ধরণের কাজে এগিয়ে আসেন । এসব প্রতিষ্ঠানে শিল্পানবিশদের সুবিধার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা ও বক্তৃতা দেবার ব্যবস্থা ছিল ।
স্বশিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু বাড়তি সুবিধা, নৈতিক উন্নতি ও সেই সঙ্গে চিন্ত বিনোদের জন্য গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করা হত । ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে এধরনের মেকানিক প্রতিষ্ঠানের দ্রুত প্রসার ঘটতে থাকে এবং অর্ধশতাব্দী যেতে না যেতেই এগুলি সারা ইংল্যান্ড ছড়িয়ে পড়ে।
এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত গ্রন্থাগারগুলি স্ব স্ব এলাকায় সাধারণ গ্রন্থাগারের পুস্তক ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।