এই পোষ্টের মাধ্যমে এস.আর রাঙ্গানাথনের লাইব্রেরি সংক্রান্ত পাঁচটি সূত্রের মধ্যে দ্বিতীয় সূত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ আলোচনা করা হয়েছে।

রঙ্গনাথনের দ্বিতীয় লাইব্রেরি সূত্র আলোচনা। Ranganathan 2nd Library Rules
Image by Wikipedia

দ্বিতীয় সূত্র : প্রত্যেক পাঠকেরই থাকবে বই

প্রথম সূত্র আমাদের গ্রন্থ ব্যবহারের চিন্তাধারায় এক বিপ্লব এনেছিল । দ্বিতীয় সূত্র সেই বিপ্লবকে আর এক স্তর এগিয়ে নিয়ে গেছে । রজ্জানাথনের মতে, “প্রথম সূত্র যদি ‘গ্রন্থ সংরক্ষণের জন্য’—এই ধারণাটিকে পাল্টে দেয়, তবেই দ্বিতীয় সূত্র “গ্রন্থ কিছু বাছাই করা মানুষের জন্য”—এই ধারণাটিকে আরও প্রসারিত করে ।

প্রথম সূত্রের বৈপ্লবিক দাবি যদি হয় “গ্রন্থ হল ব্যবহারের জন্য” প্রথম সূত্র তখনকার গ্রন্থাগারগুলিকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল, দ্বিতীয় সূত্র নতুন নতুন গ্রন্থাগার স্থাপনা করেছিল মানুষকে শিক্ষা, বিনোদন ও তথ্য সরবরাহ করতে ! প্রকৃতপক্ষে, এই সূত্র পূর্বানুমান করে নেয় যে “শিক্ষা সবার জন্য।” নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠকদের গ্রন্থাগার পরিষেবা দিতে এই সূত্র দায়বদ্ধ ।

‘প্রত্যেক’ শব্দটির উপর জোর দেওয়ার এক গূৢ অর্থ আছে। পাঠকদের চাহিদা বিভিন্ন রকমের, কাজেই প্রত্যেক পাঠককে তার উপযোগী গ্রন্থ দেওয়ার মধ্যে এক ধরনের দায়িত্ববোধ এসে যাচ্ছে । অতীতে শুধুমাত্র বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত কিছু মানুষ গ্রন্থাগার ও গ্রন্থব্যবহারের সুযোগ পেতেন ।

গণতন্ত্রের আগমনের ফলে প্রত্যেকটি নাগরিক শাসনব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার সঙ্কল্প সঙ্কল্প শুরু হয় দ্বিতীয় সূত্রের যাত্রা। দ্বিতীয় সূত্রের নিহিতার্থ অনুসন্ধান করতে রজ্জানাথন চারটি শ্রেণির আশ্রয় নিয়েছেন।

১। রাষ্ট্রের দায়িত্ব

রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে—আইন প্রণয়ন, সমন্বয় ও অর্থিক সংস্থান । সকলের কাছে পৌছোনোর উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় সূত্র দাবি করে যে গ্রন্থাগার নগরবাসী ও গ্রামবাসী, পুরুষ ও নারী, অভিজাত ও অনভিজাত, স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক, শিশু ও বয়স্ক, প্রত্যেকরই কাজে আসবে।

রাষ্ট্রের কাছে সে তাই এমন এক গ্রন্থাগারের ব্যবস্থা চালু করার আবেদন জানায়, যা সকলের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রন্থাগার পরিষেবা পৌঁছে দিতে পারবে । এটা করা সম্ভব এমন আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে যে গ্রন্থাগার ব্যবস্থাকে অর্থিক সাহায্য করবে এবং তার বিভিন্ন শাখার কাজকর্মের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে পারবে ।

সেই কারণে রজ্জানাথন রাষ্ট্রের দায়িত্বকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন : (১) অর্থিক সংস্থান, (২) আইন প্রণয়ন ও (৩) সমন্বয় সাধন ।

অর্থিক সংস্থান

সকলের প্রয়োজন মেটাতে একটি গ্রন্থাগার গোষ্ঠী বা গ্রন্থাগার শৃঙ্খল চালানোর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন যথেষ্ট অর্থের । রাষ্ট্র দুটি বিভিন্ন উপায়ে অর্থের যোগান দিতে পারে : (১) অনুদানের মাধ্যমে ও (২) গ্রন্থাগার কর চালু করে । রজ্জানাথনের পছন্দ দ্বিতীয় উপায়টি।

প্রথম উপায়টিতে রাষ্ট্র হয় প্রতি বচন বা কোন গ্রন্থকার বিকাশ পরিকল্পনার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে পারে । দ্বিতীয় উপায়টিতে রাষ্ট্র স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সম্পত্তি করের মতো কিছু কিছু করে’র উপর সেস (cess) বসানোর ক্ষমতা দিতে পারে । এিভাবে সংগৃহীত অর্থ জমা পড়ে গ্রন্থাগার তহবিলে । রাষ্ট্র সাধারণত এর সমান বা তার থেকেও বেশি অর্থ দিয়ে থাকে।

গ্রন্থাগার আইন

গণতান্ত্রিক সমাজে প্রত্যেক নাগরিকের পড়ার এবং পাঠ্যবস্তুর নাগাল পাবার অধিকার আছে। কাজেই রাষ্ট্রের কর্তব্য তাদের আজীবন পড়ার সুবিধা করে দেওয়া । এটাই হল দ্বিতীয় সূত্রের দাবি । গ্রন্থাগার আইন প্রণয়ন করে রাষ্ট্র এই দাবি অনেকাংশে মেটাতে পারে।

সমন্বয় সাধন

সমন্বয়ের অর্থ প্রতিটি স্তরে গ্রন্থাগার পরিষেবাকে যুক্ত ও সমন্বিত করা । সাধারণত লক্ষ করা যায় যে, সমস্ত গ্রন্থাগার, অথবা বেশিরভাগ গ্রন্থাগারই বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে। এই পরিস্থিতি দ্বিতীয় সূত্রের মর্মার্থের বিরুদ্ধে। সুতরাং গ্রন্থাগার ও তার পরিষেবাগুলির প্রতিটি স্তরে সমন্বয়সাধন অত্যন্ত জরুরি।

গ্রন্থাগারগুলোর মধ্যে সমন্বয় রাষ্ট্র বা দেশের হাতে থাকা সম্পদের সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করে। এই ধরনের ব্যবস্থায় জাতীয় গ্রন্থাগার থেকে রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, জেলা গ্রন্থাগার, শহর গ্রন্থাগার, গ্রামীণ গ্রন্থাগার—সকলেই একটি সুশৃঙ্খলের মতো পরস্পরের সাথে যুক্ত। প্রয়োজন সময় যখন এক গ্রন্থাগারের সংগ্রহ ও পরিষেবা অন্য গ্রন্থাগারের কাজে লাগানো যাতে পারে।

২। গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব

গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এই দুই বিষয়কে কেন্দ্র করে : (ক) গ্রন্থ নির্বাচন ও (খ) কর্মী নির্বাচন।

কোনো গ্রন্থাগারই তার প্রয়োজনমতো সব গ্রন্থ করতে পারে না। আজকের দিনে নথি উৎপাদনের পরিমাণটা আবার বিপুল। পাওয়া যায় এমন গ্রন্থাগারের সামগ্রীর এক সামান্য অংশ প্রতিটি গ্রন্থাগারের সংগ্রহের ক্ষমতা রাখে। একটি গ্রন্থাগারের আর্থিক সংস্থান সীমিত।

আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা চিন্তা করে তাকে সেই অনুযায়ী গ্রন্থ নির্বাচন করতে হয়। কিন্তু ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন চাহিদা মেটানোর জন্য সঠিক, বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন গ্রন্থ নির্বাচন মোটেই কোনো সহজ কাজ নয়। গ্রন্থ নির্বাচনের আগে পাঠকদের প্রয়োজনগুলো সম্পর্কে অবহিত হওয়া ও সেগুলির মূল্যায়ন করা বাঞ্ছনীয়। দ্বিতীয় সূত্রের নিহিতার্থই এই যে, পাঠকদের কাজে লাগে এমন সব গ্রন্থই নির্বাচন করা উচিত ও অকেজো গ্রন্থগুলিকে পরিত্যাগ করা উচিত।

নির্বাচন হওয়া উচিত ব্যক্তিগত চাহিদার ভিত্তিতে। এই প্রক্রিয়ায় আবার পাঠকগোষ্ঠীর ভিতর বিভিন্ন ধরনের মানুষদের প্রত্যেকের সংস্পর্শে আসাটাও জরুরি। চাহিদার পরিমাপ করার জন্য আধুনিক প্রণালী হল পাঠকদের প্রয়োজনগুলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এক সুসংবদ্ধ সমীক্ষা করা এবং তাদের পরিবর্তিত চাহিদা মেটাতে নীতি ও কর্মসূচিকে সেই অনুযায়ী চালিত করা।

একটি সুষ্ঠু সংগ্রহ নির্মাণের জন্য গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষের উচিত একটি সঠিক নির্বাচন ও সংগ্রহের নীতি অনুসরণ করা। কর্মী নির্বাচন এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা কোনো গ্রন্থাগারকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করতে পারে। সুতরাং সূত্রটি মেনে চলার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যার একটি দক্ষ কর্মীদল থাকা জরুরি। কর্মী নির্বাচনের সময় গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সতর্কতা নেওয়া উচিত।

৩। কর্মীদের দায়িত্ব

গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষের দ্বারা যথেষ্ট সংখ্যায় দক্ষ কর্মী নিয়োগই যথেষ্ট নয়। দক্ষভাবে নিজের নিজের কর্তব্য পালন করা যে তাদের মহান দায়িত্ব, প্রত্যেকটি গ্রন্থাগার কর্মীকে একথা উপলব্ধি করতে হবে। দ্বিতীয় সূত্রটি কর্মীদের দেওয়া রেফারেল সার্ভিসের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়।

রেফারেল সার্ভিসের কাজে গ্রন্থাগার কর্মীদের সঠিক প্রশিক্ষণ থাকা উচিত। গ্রন্থাগার কর্মীদের ভিত্তি পাঠক ও তার প্রয়োজনকে উপলব্ধি করা। সঠিক গ্রন্থটি সর্বসাধারণের কাছে তাদের উত্কৃষ্ট পাঠককে সাহায্য করা। তার সম্ভাব্য প্রশ্নের সমস্ত গ্রন্থকে তার নাগালের মধ্যে পৌঁছে দিতে কর্মীদের উচিত পাঠককে সহায়তা করা। দ্বিতীয় সূত্র দাবি করে যে, কর্মীদের উচিত গ্রন্থ, গ্রন্থপঞ্জি, ক্যাটালগ, আকরগ্রন্থ ইত্যাদি বিষয়ে ওয়াকিবহাল হওয়ার এক স্বাভাবিক দক্ষতা গড়ে তোলা।

এর ফলে গ্রন্থ সন্ধানের জটিল প্রক্রিয়াটি তাদের পক্ষে অপেক্ষাকৃত সহজ হয়ে যাবে। কোনো পাঠক গ্রন্থাগারে প্রবেশ করলে গ্রন্থাগার কর্মীদের উচিত তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। অনেক নতুন পাঠককে গ্রন্থাগার ব্যবহারের সঠিক প্রাথমিক পরিচয় করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

৪। পাঠকের দায়িত্ব

দ্বিতীয় সূত্র পাঠকের উপরেও কিছু দায়িত্ব আরোপ করে। সূত্রটি চায় যে, ধার নিতে চাওয়া গ্রন্থের সংখ্যা, ধারের সময়সীমা, ও গ্রন্থাগারের সামগ্রী ব্যবহার সম্পর্কিত সমস্ত নিয়মগুলি যেন পাঠকরা মেনে চলেন । কোনো বিশেষ সুবিধা তাঁরা যেন দাবি না করেন । গ্রন্থাগার সকলের জন্য, কাজেই একজনকে বঞ্চিত করে অন্যায় সুবিধা দেওয়া যায় না ।

তাছাড়া, গ্রন্থ থেকে পাতা কেটে নেওয়া, গ্রন্থ লুকিয়ে রাখা, সময়সীমা অতিক্রম করে গেলেও গ্রন্থ রেখে দেওয়ার মতো কাজগুলি থেকে পাঠকদের বিরত থাকা উচিত । এই ধরনের কাজের অর্থ গ্রন্থাগারের অন্যান্য পাঠকদের তাদের পছন্দের গ্রন্থগুলি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া । গ্রন্থাগারের মধ্যে ব্যবহারকারী শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে পাঠকদের নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলা উচিত ।

গ্রন্থাগারকে সমাজের এক বৌদ্ধিক কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় গ্রন্থাগার কর্মীরাই কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেন । এই হোক, এ গ্রন্থাগারে পাঠকদের এমন আচরণ করা উচিত, যেরকমটি তারা অন্যদের কাছ থেকে আশা করেন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *