এই পোষ্টের মাধ্যমে রাঙ্গনাথনের লাইব্রেরীর তৃতীয় সূত্র সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় সূত্র বলতে বলা হয় – “প্রত্যেক বইয়েরই থাকবে পাঠক”।

তৃতীয় সূত্র : প্রত্যেক বইয়েরই থাকবে পাঠক (Ranganathan 3rd Library Rules)
তৃতীয় সূত্রটি ইঙ্গিত করে যে প্রত্যেক গ্রন্থেরই নিজস্ব পাঠক পাওয়া উচিত । এই কাজটি অবশ্য অত্যন্ত কঠিন । কারণ, গ্রন্থ তার পাঠকের কাছে যেতে পারে না বা পাঠকের খোঁজ করতে পারে না । গ্রন্থ মূক ও বধির । এখানে অগ্রসর হতে হয় গ্রন্থের চরিত্র বিচার করে । প্রত্যেকটি গ্রন্থের জন্য একজন উপযুক্ত পাঠক পাওয়া উচিত । এটি দ্বিতীয় সূত্রের পরিপূরক ।
যে গ্রন্থ ব্যবহারযোগ্য নয়, তার পিছনে অর্থ ব্যয় করা অপচয় । ই ডব্লিউ ল্যাংকাস্টারের মতে, এই সূত্রের ভিত্তি হল সম্ভাব্যতার সূত্র (Law of Probability) । ল্যাংকাস্টার গ্রন্থাগারের সামগ্রী ব্যবহারের উপর গবেষণা করেছিলেন । তিনি বলেছিলেন যে, কোনো সুসংগঠিত ও উত্তম পরিবেশা বিশিষ্ট গ্রন্থাগারেও প্রত্যেকটি গ্রন্থের পাঠক পাবার সম্ভাবনা একশো শতাংশ নয় । এই সূত্রকে কাজে রূপ দেবার জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি নেওয়া উচিত ।
১. ওপেন অ্যাকসেস সিস্টেম
তৃতীয় সূত্রটিকে সফল করে তুলতে গ্রন্থাগারগুলি যেসব ব্যবস্থা নেয়, ওপেন অ্যাকসেস সিস্টেম তাদের মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য । এই ব্যবস্থায় পাঠকরা ডাকার নাগাল পেতে পারেন । ডাকার উপর চোখ বুলোতে বুলোতে তারা তাদের পছন্দসই গ্রন্থগুলি খুঁজেও পেতে পারেন ।
ক্লোজড অ্যাকসেস সিস্টেমে তারা হয়তো এইসব গ্রন্থের অস্তিত্বের কথা টেরও পেতেন না । তৃতীয় সূত্র সে কারণে ওপেন অ্যাকসেস সিস্টেমের পক্ষে । এই সিস্টেম চালু করতে গেলে তাকগুলির উচ্চতা সাড়ে ছয় থেকে সাত ফুটের মধ্যে থাকা উচিত, যাতে গড়পড়তা উচ্চতার কোনো পাঠক সহজেই সেটিকে ব্যবহার করতে পারেন । এই সিস্টেমের কয়েকটি অসুবিধাও আছে । এই সিস্টেমে গ্রন্থের অল, কিন্তু অপপরিহার্য লোকসান হওয়ার আশঙ্কা আছে ।
এখানে অনেক পাঠকই দেখা বা ব্যবহারের পর সঠিক জায়গায় গ্রন্থ রাখেন না । কিন্তু এই অসুবিধাগুলিকে মেনে নিতে হবে, যদি আমরা প্রত্যেক গ্রন্থের জন্য পাঠক অর্জন করতে চাই । এর সীমাবদ্ধতার কথা মনে রেখেও গ্রন্থাগারগুলির উচিত বিনা বাধায় ওপেন অ্যাকসেস সিস্টেম চালু করা, কারণ এই ব্যবস্থায় গ্রন্থের ব্যবহার বহুগুণ বৃদ্ধি পায় ।
২. তাকের বিন্যাস
তাকে গ্রন্থ বিন্যাসের বিভিন্ন ক্রম অনুসরণ করা যেতে পারে, কিন্তু বিষয়ভিত্তিক বিন্যাসে গ্রন্থের নিজস্ব পাঠক পাবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় । সেই কারণে শ্রেণীবদ্ধ বিন্যাসই সুপারিশ করা হয় ।
গ্রন্থের শ্রেণীবদ্ধ বিন্যাস—অর্থাৎ বিষয়ের উপর ভিত্তি করে গ্রন্থের বিন্যাসকে সর্বসময় বজায় রাখা প্রয়োজন । এর আরেক নিহিতার্থ হল গ্রন্থ সংশোধন, অর্থাৎ ভুল জায়গায় রাখা গ্রন্থকে নিয়মিতভাবে সঠিক জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়া ।
৩. ক্যাটালগ
একটি সুপরিকল্পিত, শ্রেণীবদ্ধ বিন্যাস খুবই কাম্য, কিন্তু প্রত্যেকটি গ্রন্থের তার নিজস্ব পাঠক আকর্ষণ করার বিষয়টি বিচার করলে সেটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। একে সাহায্য করার জন্য প্রয়োজন ক্যাটালগের। এটি একটি যমজ প্রক্রিয়া—একটিকে অপরটি থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।
সিরিজ-এন্ট্রি ও সাবজেক্সট ক্লাস-রেফারেন্স এন্ট্রি কখনো পাঠককে গ্রন্থের আলোচ্য বিষয়টিকে জানতে সাহায্য করে। তৃতীয় সূত্র এটিও প্রত্যাশা করে যে, কারিগরি কর্মীরা প্রত্যেকটি গ্রন্থ বা নথির বিষয়বস্তু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে অ্যানালিটিকাল এন্ট্রি প্রস্তুত করবেন, যা পাঠকদের উপকারে লাগবে।
৪. রেফারেন্স সার্ভিস
তৃতীয় সূত্র মানুষকে গ্রন্থের হয়ে প্রচারে নামতে বলে। রেফারেন্স কর্মীদের গ্রন্থগুলির গুণাবলি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা জরুরি। গ্রন্থ ও পাঠকের মিলনে ঘটকালির কাজটি তাদেরই। রেফারেন্স সার্ভিসের দেখাশোনার বিষয় এটিই।
৫. প্রচার
পাঠকদের গ্রন্থাগারের দিকে আকর্ষণ করতে এবং সাথে সাথে প্রতিটি গ্রন্থের নিজস্ব পাঠক অর্জনের সন্তাবনা বাড়াতে প্রচার হল এক শক্তিশালী অস্ত্র। প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়মিতভাবে নতুন সংযোজনগুলির তালিকা প্রস্তুত ও বিতরণ করা উচিত, যাতে তা পাঠকদের নজরে আসে।
নতুন গ্রন্থগুলি উপযুক্ত কোনো জায়গায় প্রদর্শিত করলে সেগুলি পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। সময়ে সময়ে গ্রন্থ প্রদর্শনীর আয়োজন করলে গ্রন্থের নিজস্ব পাঠক পাবার সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর হয়। অবিরাম প্রচার চালালো যেতে পারে বার্ষিক প্রতিবেদন, গ্রন্থাগারের ইস্তাহার ও পত্রিকা, মুদ্রিত ক্যাটালগ, নতুন সংযোজন তালিকা, গ্রন্থ সপ্তাহ কর্মসূচি, প্রেস বিজ্ঞপ্তি, বেতার/টেলিভিশন অনুষ্ঠান, প্রকাশ্য বক্তৃতা ইত্যাদির মাধ্যমে।
মানুষকে গ্রন্থাগারে নিয়ে আসার জন্য গ্রন্থাগারের উচিত সবরকমের স্বীকৃত পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া, যাতে প্রত্যেকটি সম্ভাব্য পাঠক একজন করে প্রকৃত পাঠকে পরিণত হয়। এর ফলে তৃতীয় সূত্রের সাফল্যের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
৬. এক্সটেনশন সার্ভিস
এক্সটেনশন সার্ভিসের এক প্রশংসনীয় উদ্দেশ্য হল পড়ার অভ্যাসের উৎসাহ দিতে গ্রন্থাগারকে এক সামাজিক কেন্দ্রের রূপ দেওয়া এবং যারা পাঠক নয়, তাদের নিয়মিত পাঠকে পরিণত করা। এক্সটেনশন সার্ভিসের লক্ষ্য হল পড়ার ইচ্ছা জাগিয়ে তোলা এবং গ্রন্থ ও পাঠকের মধ্যে ঘটকালি করা। তৃতীয় সূত্রের লক্ষ্য পূর্ণ করতে আগ্রহী গ্রন্থাগারিকেরা এই এক্সটেনশন সার্ভিসের কাজকর্ম অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে করে থাকেন।
তৃতীয় সূত্রের নির্দেশগুলি অনুসরণ করতে এবং শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে বক্তৃতা, পাঠচক্র, নাট্যগোষ্ঠী ও প্রদর্শনীর সফল আয়োজন করা হয়েছে। তৃতীয় সূত্রের দাবি মেটাতে গ্রন্থাগারিকেরা স্থানীয় উৎসব, জাতীয় নেতা বা জাতীয় চিন্তাধারার প্রতি উৎসর্গীকৃত কিছু জাতীয় দিবস ইত্যাদি পালন করেন।
৭. গ্রন্থ নির্বাচন
গ্রন্থ নির্বাচনের উদ্দেশ্যেও তৃতীয় সূত্রের একটি বার্তা আছে। গ্রন্থাগারিকের শুধুমাত্র সেই সব গ্রন্থই কেনা উচিত, যেগুলি পাঠকদের কাছে উপযোগী প্রমাণিত হবে। গ্রন্থ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় পাঠকদের রুচি ও চাহিদাকে পূর্ণ মর্যাদা দেওয়া উচিত। তৃতীয় সূত্র এক সুষ্ঠু গ্রন্থ নির্বাচন নীতি দাবি করে।
৮. জনপ্রিয় বিভাগের ব্যবস্থা
সংবাদপত্র, পত্রপত্রিকা ইত্যাদি জনপ্রিয় বিভাগগুলির ব্যবস্থা পাঠকদের প্রলুব্ধ করে ও গ্রন্থাগারে তাদের উপস্থিতি বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে প্রত্যেক গ্রন্থের নিজস্ব পাঠক পাবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।