সমাজকে বলা যেতে পারে গ্রন্থাগারের অহি। সমাজের আহ্বানেই গ্রন্থাগারকে সাড়া দিতে হয় এবং সমাজের কাছেই সে দায়বদ্ধ। কাজেই গ্রন্থাগার কী ছিল, কী হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কী হাতে পারে, তা বোঝার জন্য সমাজের বৈশিষ্ট্যগুলির দিকে নজর দেওয়া আবশ্যক।
বহু বছর আগে এক বিশিষ্ট গ্রন্থাগারিক বলেছিলেন, “একটি গ্রন্থাগার গঠিত হয় গ্রন্থ, মেধা ও আবাস নিয়ে।” এর সাহায্যে যথাক্রমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন মজুত গ্রন্থভাণ্ডার, কর্মী ও কর্মসংস্থানকে। তাঁর এই উক্তিটিকে ঠিক বুদ্ধিদীপ্ত বা জ্ঞানগর্ভ আখ্যা দেওয়া যায় না। কারণ এগুলি ছাড়াও একটি চতুর্থ উপাদান থাকা অত্যন্ত জরুরি: পাঠক। পাঠকের অনুপস্থিতিতে গ্রন্থাগার গ্রন্থের সমাধিস্থল ছাড়া আর কিছু নয়।
কাজেই শুধুমাত্র গ্রন্থ ও গ্রাফিক নথিপত্রের সমাহারকে আমরা গ্রন্থাগার বলতে পারি না। গ্রন্থাগার শুধুমাত্র এইসব উপাদানের সংরক্ষণের এক স্থানবিশেষ হতে পারে না। গ্রন্থাগার হল এক প্রতিষ্ঠান। এটি একটি পদ্ধতি, যা গ্রন্থ ও গ্রাফিক নথিপত্রের সংরক্ষণ ও ব্যবহার সহজতর করে তোলে।
গ্রন্থাগার হল ভাবনাচিন্তা করার এক সহৃদয় আবাস, যাকে সকলেই নিয়মিত ব্যবহার, উপভোগ ও সম্মান করতে পারে। যে সব মানুষ কৌতুহলী, যাদের মন সক্রিয় ও অনুসন্ধিৎসু, গ্রন্থাগার তাদের কাছে এক নিশ্চিত আশ্রয়। মানুষ কেন গ্রন্থাগারে আসেন, এই প্রশ্নের উত্তরে গ্রন্থাগারিকেরা বলে থাকেন যে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতেই তারা গ্রন্থাগারে আসেন।

অথবা আসেন চিত্তবিনোদের জন্য পড়াশোনা করতে বা সামাজিক মেলামেশার উদ্দেশ্যে। গ্রন্থাগারের মূল চরিত্রটি অবশ্য পাল্টে যায়, যদি ওই প্রশ্নের উত্তরে বলা হয় যে মানুষ সেখানে আসেন তাদের অনিশ্চয়তা দূর করতে, বা পরিস্থিতির সন্জো লড়াই করার ক্ষমতা অর্জন করতে, বা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে অথবা এমন কিছু খুঁজতে যাতে তাদের দুশ্চিন্তা দূর হয়।
সুতরাং, গ্রন্থাগার ব্যবহারের উদ্দেশ্য শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়, সমস্যার সমাধানও বটে। তথ্য সংগ্রহ এখানে আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যবস্তু নয়, সমস্যা সমাধানের তা এক উপায় মাত্র।
কাজেই আধুনিক ধারণায় গ্রন্থাগার হল এক যুক্তিসঙ্গত, স্বাভাবিক পরীক্ষাগার, যেখানে তথ্য সংগ্রহ, সেগুলির একত্রীকরণ, এবং সমস্যা সমাধান প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত তথ্য ব্যাকস্থা ও বৌদ্ধিক অনুশীলনের সাহায্যে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ বা সম্পর্ক স্থাপন বিষয়ে স্থান লাভ করা যায়।
কোনো কোনো সময় ছোটখাট কাজকর্মে লিপ্ত হতে দেখা গেলে, গ্রন্থাগারের মূল উদ্দেশ্য সাধারণত একই থাকে। সেই উদ্দেশ্যটি হল যোগাযোগের এক সেতা হিসাবে কাজ করা, যার লক্ষ্য হল নথিভুক্ত জ্ঞান, ভাবনা ও চিন্তার সংরক্ষণ। এই ফলেই অতীত কথা বলতে পারে ভবিষ্যতের সাথে।
ভবিষ্যতে স্থান, কাল পরিব্যাপ করে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো উন্নত হয়ে উঠবে। আজকের দৃশ্য, শব্দ এমনকী স্বাদ ও গন্ধ ভবিষ্যতের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত থাকবে আমাদের সভানসমততীদের’ ও তারাও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।
সামাজিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে (social institution)
নৃতত্ত্ববিদদের মতে, সর্বজনীন উদ্দেশ্য সাধন করতে ও সর্বজনীন প্রয়োজন মেটাতে একত্রে কর্মরত মানুষদের নিয়েই গঠিত হয় সমাজে। আধুনিক সমাজে মানুষের সমস্ত ক্রিয়াকলাপ প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সংগঠিত হয়। যেমন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি দৃষ্টি দেয় বিশ্বাস ও ঐক্যের দিকে, আবার, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলি জ্ঞান, দক্ষতা ও সামাজিক সম্পর্কের বিকাশ ঘটায়। এই প্রতিষ্ঠানগুলি নিজেদের মধ্যে কিছু আনুষ্ঠানিক ও কিছু অলিখিত বিধিনিয়মের মাধ্যমে সমাজের ক্রিয়াকলাপকে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে।
সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে সামাজিক লক্ষ্য পৌছানোর এক উপায়। অবশ্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলির রূপ সমস্ত ধরনের সমাজে একইরকম হয় না। সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ ও বিধিনিয়মই এগুলির রূপ নির্ধারণ করে। সমাজবিজ্ঞানের মতে, মূল্যবোধ হল সমাজের মানুষের অন্তর্গত কিছু দৃঢ় ধারণা, যা ঠিক করে দেয় কী ভালো বা কী মন্দ, কী কাম্য বা কী অকাম্য। এটি একটি মানদন্ড, যার সাহায্যে নির্ধারণ করা হয় কী ধরনের আচরণ অনুমোদন করা যায় বা যায় না। আধুনিক সমাজ সাধারণত সাম্য, স্বাধীনতা, জাতীয় চরিত্র, সাফল্য, বাস্তববাদীদের মতো মূল্যবোধগুলিকে গুরুত্ব দেয়। সমাজবিজ্ঞানের বিধিনিয়মগুলো আসলে সমাজের প্রতিটি সদস্যের আচরণকে সঠিকভাবে পরিচালনা করে। মূল্যবোধ আমাদের জন্য এক সর্বজনীন ও সামাত্রিক পথনির্দেশিকা রচনা করে। অন্যদিকে, বিধিনিয়মগুলো ব্যক্তি মানুষের আচরণের সূক্ষ্ম দিকগুলিও নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে।
সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে গ্রন্থাগার (library as a social group)
গ্রন্থাগার আজ এক সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এর সৃষ্টি যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি অঙ্গ হিসাবে, যা সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য আবশ্যিক। সত্যি কথা বলতে কী, যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়া সমাজের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। কোনরকম গ্রাফিক নথি না থাকলে বা তাদের সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করলে কোনো সংস্কৃতি স্থায়ী হতে পারে না।
গ্রন্থাগার সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাকে সুনিশ্চিত করে ও বিভিন্ন যুগের সংস্কৃতির মধ্যে এক যোগসূত্র রচনা করে। একথা সত্যি যে আগেকার দিনে গ্রন্থাগারগুলি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করত না। কারণ, সেই সময় গ্রন্থাগার ছিল কোনো ব্যক্তিবিশেষ বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি। গ্রন্থ সংগ্রহ রাখত তালাবদ্ধ আলমারির ভিতর।
প্রাচীনকালে গ্রন্থ লেখা হত হস্তাক্ষরে এবং তার সীমিত সংখ্যক প্রতিলিপি পাওয়া সম্ভব হত। পাণ্ডুলিপির অনেকগুলি প্রতিলিপি তৈরি করা ছিল এক দুঃসাধ্য ও ব্যয়সাপেক্ষ কাজ। কাজেই, প্রতিলিপি তৈরি ও সেগুলির নিরাপদ
সংরক্ষণের ব্যয়ভার বহন করা ক্ষমতা ছিল শুধুমাত্র রাজরাজড়া ও ধনী জমিদারদের । রাজারাজড়া ও জমিদাররা তাদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যেই গ্রন্থাগার চালু রাখতেন ।
বহু শতাব্দী ধরে বেশিরভাগ গ্রন্থাগারই ছিল নিজস্ব মালিকানাধীন। সেগুলি হয়তো ছিল কোনো বিদ্বান মানুষের নিজস্ব সম্পত্তি বা কোনো ধনী মানুষের নিজস্ব সংগ্রহ । ধনী মানুষেরা গ্রন্থ সংগ্রহ করতে পছন্দ করতেন, কারণ সেগুলি ছিল তাদের ঐশ্বর্যময় চিহ্ন।
প্রাচীন মঠগুলোর সংগ্রহ এবং নালন্দা ও বিক্রমশীল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারগুলিকে সম্ভবত প্রথম “প্রতিষ্ঠান” হিসেবে চিহ্নিত করা যায় । প্রাচীন ভারতে বৌদ্ধ মঠগুলোর সজ্জা সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপিত হয়। গ্রন্থাগার অবদানিভাবে এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর এক অঙ্গ ছিল।
মুঘল আমলে রাজারাজড়াদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে গ্রন্থাগার তৈরি হয়-কোনো কোনো সময় তাদের পৃষ্টপোষকতায় মন্দিরগুলিতে গ্রন্থাগার গড়ে ওঠে । ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতে প্রথম দিকের ইউরোপীয়ান গ্রন্থাগারগুলিকে পরিচালনা করতেন মিশনারিরা। মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কারের সজ্জা সজ্জা এক নতুন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা হয় ।
এই আন্দোলন মানুষের বৌদ্ধিক অনুসন্ধিৎসাকে এক নতুন প্রেরণা জোগায়, যা আধুনিক যুগের স্বাধীন চিন্তা, শিক্ষা ও আবিষ্কারের এক পূর্বলক্ষণ ।
‘প্রতিষ্ঠান’ বলতে এখন পরোক্ষভাবে সংস্থা ও কার্যালয় বা ভবন, দুই-ই বোঝানো হয় । আমরা কোনো ব্যক্তিবিশেষের বর্ণনা প্রসঙ্গ বলি যে, তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থায়ী স্বীকৃতি পেতে চলেছেন। এছাড়াও কোনো প্রতিষ্ঠানই বারংবার, দ্রুত এবং মৌলিকভাবে নিজের পরিবর্তন ঘটায় না ।
বহু প্রজন্ম ধরে তাদের এক স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখতে হয় । সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রন্থাগারের সামাজিক প্রগতির কোনো বিচ্ছিন্ন দৃষ্টান্ত নয়, যার কোনো বিশেষ স্তর বা বিশেষ কর্তব্য আছে। গ্রন্থাগারের প্রকৃত রূপ ও উদ্দেশ্য প্রথম যুগে অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট থাকলেও, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে ‘সামাজিক’ শব্দটি মানুষের চিন্তাধারার মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে নেয় ।
এইসব ধারণাগুলিকে একটি স্থায়ী রূপ দিতেই হতো উনবিংশ শতাব্দীর গুণীজনেরা গ্রন্থাগারকে এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। একবার গড়ে ওঠার পর সেগুলিকে ভেঙে দেওয়ার কোনো চিন্তাভাবেই আর প্রশ্ন দেওয়া হয়নি । সাংস্কৃতিক ও শিল্পের প্রসার ঘটিয়ে তারা সভ্য সমাজের কাঠামোর এক অপরিহার্য অঙ্গ। হাসপাতাল যেমন আমাদের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নেয়, অনেকটা সেরকমই ।
সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রন্থাগারের সামাজিক প্রগতির কোনো বিচ্ছিন্ন দৃষ্টান্ত-তা সামগ্রিক বিকাশের এক আবশ্যিক অঙ্গ। সমাজ নানা রকমের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে । এইসব প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিবিশেষকে সমাজের অঙ্গ করে তোলে । প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান সমাজের কোনো-না-কোনো প্রয়োজন মেটায় । গ্রন্থাগারের সৃষ্টি সমাজের সমস্ত প্রয়োজন মেটানোর জন্য ।
আধুনিক সমাজের চাহিদা সম্পর্কে
আধুনিক সমাজের চাহিদা নানা রকমের, যাদের মধ্যে শিক্ষা সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা একজন জ্ঞানসম্পন্ন, ওয়াকিবহাল, দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করতে সাহায্য করে, যাদের ছাড়া সমাজকে প্রগতি ও বিকাশের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় । প্রকৃতপক্ষে আধুনিক সমাজ আশা করে যে তার সদস্যরা হবে সংঘমী, জ্ঞানী, দয়ালু এবং প্রেম সৌন্দর্য ও স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতন।
আর্থিক স্বচ্ছলতা সমাজের এক মৌলিক চাহিদা । এর জন্য সমাজের প্রয়োজন প্রযুক্তিগত উন্নতি, যার জন্য প্রয়োজন জরুরি গবেষণা ও উপযুক্ত তথ্যাভাণ্ডার । আধুনিক সমাজের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হল উন্নত প্রযুক্তি, বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা এবং উন্নততর জ্ঞান ।
“মানুষ শুধুমাত্র রুটির সাহায্যে বাঁচে না।” মানুষের সূক্ষ্ম প্রবৃত্তিগুলি তার জীবনধারাকে পরিশুদ্ধ করে এক উচ্চতর স্তরে পৌঁছে দেয়। ইতিহাসের উষাকাল থেকে অবকাশ যাপনের বিলাসিতা শুধুমাত্র স্বল্পসংখ্যক ভাগ্যবানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
ধনী ও ক্ষমতাশীল মানুষেরা এই অবকাশ অর্জন করতে পেরেছিলেন, কারণ দরিদ্র ও দুর্বল মানুষেরা তাদের জীবনভর শ্রমের শৃঙ্খলে বাঁধা থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। শ্রম থেকে মুক্তি স্বাধীনতার অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত রূপ। আধুনিক সমাজ এই রূপ আর দৃষ্টির নাগালের বাইরে নয়।
এই রূপ এখন শুধু সেই সব ধনীদের জন্য নয়, যারা যন্ত্রের মালিক। এখন এই রূপ সবার জন্য, এমনকী যারা যন্ত্র চালায় তাদের জন্যও।
বর্তমান শতাব্দীতে বিভিন্ন রকম প্রয়োজন মেটাবার জন্য বিশেষ ধরনের গ্রন্থাগারের প্রসারের মধ্যে উন্নত সমাজগুলিতে ঘটা যাওয়া শিল্প ও প্রযুক্তি বিপ্লবের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। সু-নির্দিষ্ট ও নির্ভুল তথ্যের দ্রুত নাগাল পাওয়ার দাবির সঙ্গো সঙ্গো এসেছে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির অভ্যুগমন।
গবেষণামূলক কাজকর্মের ব্যাপক প্রসার, সরকার এবং ব্যবসা ও শিল্পমহলকে কাজকর্মের প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্যের গুরুত্বকে নতুন করে উপলব্ধি করতে বাধ্য করছে। সমাজে তথ্যের বাড়তি চাহিদা ছোট, বড় ও অত্যন্ত বিশেষ ধরনের গ্রন্থাগারকে প্রভাবিত করছে এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর রদবদল করা হচ্ছে। পরিকল্পনা করা হচ্ছে এক ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের, যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহু গ্রন্থাগারের সম্পদগুলিকে সংযুক্ত করতে পারবে।
এটা লক্ষ করা যাতে পারে যে, আধুনিক সমাজের যেসব প্রাথমিক প্রয়োজন গ্রন্থাগারগুলো মেটায়, যেমন শিক্ষা, গবেষণা, তথ্য, নান্দনিক উপলব্ধি, বিনোদন- এগুলি সবই অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও পাওয়া সম্ভব। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে গ্রন্থাগারই হল একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা সভ্যতার সমস্ত ‘স্মারকের সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিযুক্ত করে।
যে সমাজে শিল্পায়নের মাত্রা বেশ উচ্চ, সেখানে জ্ঞান এবং নিখুত ও সময়োচিত তথ্যের চাহিদা প্রায় সীমাহীন। আর সমগ্র বিশ্বজুড়ে যখন দ্রুত ও মৌলিক পরিবর্তন ঘটি চলেছে, গ্রন্থাগারের চাহিদাও হয়ে উঠছে প্রায় সীমাহীন।
আধুনিক সমাজে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলি পরিবর্তিত হচ্ছে। আমাদের আরও বেশি বৈচিত্র্যময়, স্বাধীন ও উচ্চশিক্ষিত হয়ে ওঠার সঙ্গো সঙ্গো জন্ম নিচ্ছে এক নতুন সামাজিক চেতনা। অতীতের চেয়ে অনেক বেশি করে আধুনিক সমাজ এখন ব্যক্তির স্বাধীনতার অধিকার, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের অধিকার এবং তার সমস্ত সম্ভাবনাকে বাস্তব করে তোলার প্রয়াসকে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
কোনো ব্যক্তি মানুষের কাছ থেকে সমাজের এই বিপুল প্রত্যাশার কথা আমরা যখন চিন্তা করি, তখনই আমরা প্রতিষ্ঠান হিসাবে সমাজে গ্রন্থাগারের পূর্ণ সম্ভাবনার কথা উপলব্ধি করতে পারি।