
রঙ্গনাথন লন্ডনের স্কুল অফ লাইব্রেরিয়ানশীপ, ইউনিভার্সিটি কলেজে অধ্যয়ন করেছিলেন। এছাড়াও তিনি শতাধিক গ্রন্থাগারে গিয়ে তাদের কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে কোনো সর্বজনীন নীতি অনুসরণ না করে গ্রন্থাগারগুলো তাদের নিজস্ব স্বাধীন পথায় বড়ে উঠছে।
১৯২৫ সালে ইংল্যান্ড থেকে ফেরার স্বল্পকালে পরে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের গঠন কর্মে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। এখানে তার প্রচলন করা নতুন ব্যবস্থাগুলি গ্রন্থাগারের যাবতীয় কাজকর্মকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কিছু আদর্শ নিয়মনিষ্ঠ প্রণয়ন করতে তাঁকে প্রেরণা জুগিয়েছিল।
১৯৩১ সাল গ্রন্থাগার জগতের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য বছর। এই বছরেই একটি যুগের অবসান হয়, সূচনা হয় অন্য এক যুগের। মেলভিল ডিউই চির বিদায় নেন, এদিকে রঙ্গনাথনের নিয়ে আসেন তাঁর পাঁচ সূত্র বা পঞ্চসূত্র।
এগুলি প্রকাশিত হয় ‘‘গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের পঞ্চসূত্র’’ গ্রন্থে—যে গ্রন্থটিকে ভবিষ্যতের দিশারি আখ্যা দেওয়া হয়। গ্রন্থাগারের কাজকর্মকে বৈজ্ঞানিকভিত্তিক করে তোলার পথে এই রচনাই ছিল তাঁর প্রথম পদক্ষেপ।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে প্রথমে রঙ্গনাথন দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম, এই চারটি সূত্র প্রণয়ন করেছিলেন। রঙ্গনাথনের গ্রন্থাগারে অধ্যাপকই ছিলেন বি রসের নিত্য যাতায়াত। একদিন কথাচ্ছলে অধ্যাপক রসের দেওয়া এক ইঙ্গিত রঙ্গনাথনকে তাঁর প্রথম সূত্রের ধারণা জোগায়।
রঙ্গনাথনের মানসিক যন্ত্রনার কথা অনুমান করে রস একদিন এই বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন। রঙ্গনাথন তাঁর যন্ত্রনার কারণ ব্যাখ্যা করার পর, গ্রন্থাগার থেকে বিদায় নেবার মুহূর্তে দৈববাণীর মতো রস হঠাৎই বলেন : ‘‘আপনি বলতে চাইছেন গ্রন্থ মানুষের ব্যবহারের জন্য!’’ এর থেকেই জন্ম হয় প্রথম সূত্রের, আর তার সাথেই সম্পূর্ণ হয় রঙ্গনাথনের সূত্রগুচ্ছ।
পঞ্চসূত্র সংক্রান্ত ক্রিয়াকলাপের দর্শন
এই পাঁচটি সূত্র থেকে আমরা বেশ কয়েকটি সাধারণ নীতি পাই, সেগুলি থেকে গ্রন্থাগারের সমস্ত ধরনের কাজকর্ম সম্পর্কে ধারণা করে নেওয়া যায়। চার থেকে ছয়টি শব্দের মধ্যে দিয়ে অতি সংক্ষেপে রজ্জানাথন। এই সূত্রগুলি উপস্থাপন করেছেন “গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের পঞ্চসূত্র” গ্রন্থটি প্রকৃতপক্ষে গ্রন্থাগারের কর্মধারায় যে দর্শন প্রতিফলিত হয়, তার এক সংক্ষিপ্তকরণ।
তাঁর নিজের ভাষায়, ‘গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের পাঁচটি সূত্র’ গ্রন্থে সংক্ষিপ্তকূপে সব কিছুই বলা হয়েছে, যা ভবিষ্যতের এই শ্রেণির গ্রন্থগুলিতে আরো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই সূত্রগুলিতে গ্রন্থাগারের কর্মধারা নিয়ে যথেষ্ট দার্শনিক আলোচনা আছে। তিনি সেগুলিকে সহজভাবে ও এক সুসংবদ্ধরূপে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন এবং পাঁচটি অতীবশ্যক নীতির সাহায্যে সেগুলিকে বাঁধার চেষ্টা করেছেন।
এই নীতিগুলি গ্রন্থাগার সংগঠন, পরিচালন ও তার কর্মধারাকে আরো কার্যকরী করে তোলার জন্য কী প্রয়োজন, সেই বিষয়ে আমাদের নির্দেশ দিতে সক্ষম।
এই পাঁচটি সূত্রের নিয়মবিধি আমাদের পথের নির্দেশ দেয়-এগুলি কয়েকটি ঐক্যবদ্ধ নীতি, যা গ্রন্থাগার জগতের সর্বত্র প্রযোজ্য। এই নীতিগুলির মূল্য এই যে এরা বাইরের নির্দেশ মেনে আসেনি, এসেছে ভিতর থেকে এক নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।
রঙ্গনাথনের পাঁচটি সূত্র গ্রন্থাগার দর্শনের পঞ্চভুজ হিসাবে বিশ্বজনীন স্বীকৃতি লাভ করেছে। সূত্রগুলি হল :
- বই ব্যবহারের জন্য
- প্রত্যেক পাঠকেরই থাকবে বই
- প্রত্যেক বইয়েরই থাকবে পাঠক
- পাঠকের সময় বাঁচান
- গ্রন্থাগার এক ক্রমবর্ধনশীল প্রতিষ্ঠান
পাঁচটি সূত্রকেই আপনার দৃষ্টিতে সরল এবং স্বতঃসিদ্ধ মনে হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এগুলি কিন্তু গভীর জ্ঞানপূর্ণ। নিম্নে শ্রী রঙ্গনাথন এর পাঁচটি সূত্রের মধ্যে শুধুমাত্র প্রথম সূত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ আলোচনা করা হলো।
প্রথম সূত্র : বই ব্যবহারের জন্য
প্রথম সূত্রের নিন্দনীয় অবহেলার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত সম্পর্কে আমরা অবহিত। অতীতে গ্রন্থাগারের তাকে (shelf) গ্রন্থগুলি শিকল দিয়ে বাঁধা থাকত। সেগুলি ছিল সংরক্ষণের জন্য, ব্যবহারের জন্য নয়। গ্রন্থাগারকে গ্রন্থের ব্যবহার প্রসারিত করার কোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হত না, তা ছিল গ্রন্থ সংরক্ষণের নিছক এক স্থানবিশেষ। প্রথম সূত্রের আগমন ধারাবাহিকভাবে যা করতে চেয়েছিল তা হল : গ্রন্থকে শিকল থেকে মুক্ত করা, বাঁচাই কয়েকজনকে গ্রন্থ ব্যবহার করতে দেওয়া, যারা অর্থ দিতে পারবে তাদের সুযোগ দেওয়া, গ্রন্থাগারের ভিতরে বিনামূল্যে সবারই সুযোগ দেওয়া এবং শেষে সবারকে বিনামূল্যে গ্রন্থ ধার দেওয়া। আধুনিক কোনো গ্রন্থাগারিক তখনই তৃপ্ত হন, যখন ব্যবহারকারীরা গ্রন্থের তাক শূন্য করে দেন।
১। অবস্থান
গ্রন্থাগার অবস্থিতি হওয়া উচিত কোনো ব্যস্ত, কেন্দ্রীয় অঞ্চলে, যেখানে বেশিরভাগ নাগরিককে প্রত্যহ কর্মসূত্রে যাতায়াত করতে হয়। গ্রন্থাগারের কেন্দ্রীয় অবস্থান গ্রন্থের ব্যবহার বাড়ায়। কোনো গ্রন্থাগার স্থাপন
করা, কোনো দোকান খোলার মতোই। জনশূন্য, বিচ্ছিন্ন কোন জায়গায় দোকান খুললে তার ভাগ্যে কী আছে তা সহজেই অনুমেয়। প্রথম সূত্রটি আবার গ্রন্থাগারের মধ্যে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ মানুষকে আকর্ষণ করে এবং তার ফলে সেখানে গ্রন্থ ব্যবহারের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
২. ওপেন অ্যাকসেস
ওপেন অ্যাকসেস প্রণালীতে গ্রন্থের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এই প্রণালীতে প্রত্যেক পাঠক তার কাছে গিয়ে নিজের পছন্দমতো গ্রন্থ নির্বাচন করতে পারেন। এতে সময়ের সাশ্রয় হয়, কারণ পাঠককে তার পছন্দের গ্রন্থ বা উপযুক্ত কোনো বিকল্প খুঁজে নিতে গ্রন্থাগারিকের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। পাঠক সোজাসুজি তার কাছে পৌঁছে নিজের জন্য গ্রন্থ দেখতে পারেন। তার পছন্দের গ্রন্থটি না পেলে পাঠক এখন অন্য কোনো বিকল্প গ্রন্থ খুঁজে নিতে পারেন।
৩. গ্রন্থাগারের কাজের সময়
প্রথম সূত্র দাবি করে যে গ্রন্থাগার ঠিক সেই সময় ধরে খোলা রাখা উচিত, যা ব্যবহারকারীদের পক্ষে সুবিধাজনক হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো জনগ্রন্থাগার সন্ধ্যার সময় খোলা রাখা উচিত, যাতে বিভিন্ন পেশার মানুষ তারা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম শেষ করে সেটি ব্যবহার করতে পারেন। গ্রন্থাগার দিনের দীর্ঘ সময়ব্যাপী এবং কোনো ছুটি ছাড়া বছরের প্রতিদিন খোলা রাখা উচিত। গ্রন্থাগারের কাজের সময় ব্যবহারকারীদের পক্ষে সুবিধাজনক হওয়া উচিত।
৪. গ্রন্থাগার ভবন ও আসবাবপত্র
গ্রন্থাগার ভবনটি উপযোগী হওয়ার সাথে সাথে দৃষ্টিনন্দন হওয়া বাঞ্ছনীয়। আসবাবপত্র এমন থাকা উচিত, যা পাঠকদের পক্ষে আরামদায়ক হয় ও গ্রন্থাগারের সামগ্রীগুলি ব্যবহারের জন্য সুবিধাজনক হয়। গ্রন্থ রাখার তাকগুলি বেশি উচু হওয়া উচিত নয়, যাতে উচ্চতম তাকটির গ্রন্থগুলি কাছে সহজেই পৌঁছানো যায়।
৫. গ্রন্থাগার কর্মী
গ্রন্থাগার ভবন যত আকর্ষণীয় হোক, আসবাবপত্র যত আরামদায়ক হোক, গ্রন্থ সংগ্রহ যত সমৃদ্ধ হোক, তার কর্মীরা সুশৃঙ্খল ও কাজের প্রতি নিবেদিত না হলে গ্রন্থাগার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন না। গ্রন্থাগারের কর্মীদের সব সময়েই পাঠকদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। আবার কর্মীদেরও প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া উচিত। মধুর, বিনয়ী ব্যবহার, পাঠকদের সাহায্য করার ইচ্ছা ও পেশাদারি দক্ষতা, এগুলিই হল প্রথম সূত্র অনুযায়ী কর্মীদের আবশ্যিক যোগ্যতা।
৬. গ্রন্থ নির্বাচন নীতি
শুধুমাত্র সেই সব গ্রন্থই সংগ্রহ করা উচিত, সেগুলি ব্যবহারকারীদের চাহিদা মেটায়। দ্বিতীয়ত, গ্রন্থগুলি সুন্দর হওয়া উচিত যা পাঠককে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। কাজেই গ্রন্থ নির্বাচন নীতির উচিত প্রথম সূত্রকে অনুসরণ করা।
৭. প্রচার
প্রথম সূত্র দাবি করে যে, গ্রন্থাগার এবং তার সংগ্রহের প্রতিটি গ্রন্থের প্রচার হওয়া উচিত। এই প্রচার চালানোর নানারকম উপায় আছে। গ্রন্থাগারে নতুন সংগ্রহগুলির একটি তালিকা পাঠকদের নজরে আনার জন্য কোনো সুবিধাজনক জায়গায় প্রদর্শিত করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
গ্রন্থাগারতত্ত্বের আধুনিক তত্ত্ব প্রকৃতপক্ষে “গ্রন্থ ব্যবহারের জন্য” – প্রথম সূত্রের এই বক্তব্যের উপরেই প্রতিষ্ঠিত। এই সূত্রটির নিহিতার্থ অবশ্য তথ্যবাহী গ্রন্থকে ব্যবহারকারীদের নাগালে এনে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
প্রকৃতপক্ষে, প্রথম সূত্রের প্রভাব হলো ব্যাপক, প্রগাঢ় এবং বৈপ্লবিক । দৃষ্টিভঙ্গির একবার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেলে, অন্য সবের জন্য ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা।